ঈদের আগে বাড়ি যাওয়ার সময় হলে, দাদী যেভাবে গেটে বসে থাকতো : আব্দুল জব্বার

ঈদের আগে বাড়ি যাওয়ার সময় হলে, দাদী যেভাবে গেটে বসে থাকতো
আব্দুল জব্বার

কয়েকবছর ধরেই রোজা কিভাবে চলে যায় বুঝতেই পারিনা! সেদিন শুনলাম ১৫ টা গেছে আর আজকেই সাতাইশা রাত। শেষ হয়েও গেল প্রায়। তিনটা বেজে ৩৮ মিনিট। অথচ ছাত্রজীবনে শুরু হতো তিন রোজা দিয়ে। তারপর সাতটা, দশটা করে বিশটায় গেলেই চিন্তা, ভিতরের রিংটোন বাজতে শুরু করতো- কবে বাড়ি যাবো?

সাদ্দামরা মনে হয় কোটাল নানার ( মোখলেসুর রহমান) আম খ্যায়া শেষ করে ফেল্লো! নদীতে পানি আছে নাকি ফোন করে শুনতে হবে। বাড়ি যেয়েই নদীতে গোসল করতে হবে। কতোদিন পানির নিচে ডুব দিয়ে গোসল করিনা! একটা নতুন বল আর টেপ কিনে নিয়ে যেতে হবে।আমাদের পাড়ায় অনেক গুলো বাড়িতে মিষ্টি, তাজা পেয়ারার গাছ আছে। তারমধ্যে লিটন কাক্কাদের বাড়ির ভিতরের গাছের পেয়ারা সবচেয়ে ভালো। পুরো আপেলের মতো কামড় দিলে মুড়মুড় করে। এবার যেয়ে মন ভরে খাবো।

গতবার গিটার নিয়ে বাড়ি গিয়েছিলাম বলে আব্বা আমাকে এক প্রকার অপমান-ই করেছে। কিন্তু তারপরও গিটার আমাকে নিয়েই যেতে হবে। থাকতে পারিনা আমি আমার বেলিকে ছাড়া। গিটার না নিয়ে গেলে আব্বা যেমন খুশি হয়, তেমনি তৌহিদের মন অনেক খারাপ  হয়। তাছাড়া বিকেলে ব্রীজে গান করব কিভাবে গিটার ছাড়া! আর গান ছাড়া তো চলবেই না আমার। আমার বাড়ি যাবার কথা শুনলে অনেকেই দুই-তিন আগে থেকে মনে করিয়ে দেয়, ‘গিটার যেন না রেখে আসি।’ গিটার ভালো না লাগলেই যে বাবা খারাপ হয়ে যায় তা কিন্তু না। আমার বাবা পৃথিবীর সেরা বাবা। এগুলো একবার যখন ভাবা শুরু হতো আর কিসের কি! তার দুই-একদিন পরেই চলে যেতাম- হুরাসাগরের তীরে, আমার মায়ের কাছে সমেশপুরে।

তখন-ই ভালো ছিল। আর গত কয়েক বছর ধরে ঈদের সময় গুলো যে ভাবে পার হয়- ‘এতো পড়ালেহা কইর‍্যা তালি কি অইলো বাপু! আংগোরে গেদা আহুন ভালই ট্যাহা-পয়সা দেয়। সামনের মাসে নাকি আবার বেতন বাইড়বো। কোনও জাগায় ঢুইকছ্যাও কি?’ ‘না কাকা হচ্ছে না কোন ভালো চাকরি।’ নরম সুরে জবাব দেই আমি আর মনে মনে বলি (পৃথিবীতে এসেছি আল্লাহর গোলামী করতে মানুষের না, কিছুদন পরেই বুঝবেন)। আমার অবচেতন মনের ভাবনা কেড়ে নিয়ে কাকা আরো বলে, তোমার বাপ কতো কষ্ট করে তোমাদের চারটা ভাইকে হালাল করছে আমরা কিন্তু জানি।’

ঈদ শপিং ও দুই বন্ধুর গল্প

বিকেলে আমার কিছু প্রিয় বন্ধু, আনিস, সুমন, কবির, আরিফ ওরাও এই কথায় সেই কথায় চাকরীর আলাপ শুরু করে, আমার বস তো এখন আমাকে ছাড়া কিছু বোঝেই না! এমন ভাবে আটকিয়েছি আর চাইলেও ছাড়তে পারবেনা।’ ‘গিটার-মিটার বাদ দিয়ে চাকরী শুরু কর। ছোট-বড় যেকোন জব হোক। একবছর লেগে থাকতে পারলেই হইছে।’ ‘আমাদের তো আর জমিদারি নাই, বাপু চাকরী ছাড়া কোন বুদ্ধি নাই। বিয়া-সাদি করতে হবে আরেক ঝামেলা, খালি টাকার দরকার’। আমি শুধু শুনি আর একটার পর একটা সিগারেট জ্বালাই।

সবার থেকে আলদা কেবল আমার গর্ভধারিণী, আমার মা। তার একটাই চিন্তা-ঢাকায় কি না কি খায়। চাকরী- বাকরীও করেনা যে টাকা-পয়সা থাকবে সাথে। যে কয়দিন থাকবে যে ভাবেই হোক শরীরটা একটু কিভাবে ঠিক করে দেয়া যায় এ দায়িত্ব তার থেকে আর ভালো কেউ পালন করতে পারেনা। একটা জিনিস আমি প্রতিনিয়ত অনুভব করি-মা তার ভালোবাসা গুলো জমিয়ে রাখেন রান্না ঘরে। বাড়িতে যেয়ে প্রথম যে খাওয়া-আলুভর্তা হোক, শাক ভাজি হোক। মায়ের জমিয়ে রাখা ভালোবাসা গুলো খেয়ে আপনি কিন্তু নিমিষেই শক্তিদেবতা হয়ে যান। আর চলে আসারদিন, দুধ-কলাও পেটে ঢোকেনা আমার। তুমিও খেতে পারোনা মা আমি জানি। আমি তোমার দৃষ্টির আড়াল হলে সইতে না পেরে তুমি এখনো কাদো….

আমাদের বংশের মানুষ আদিম যুগ থেকেই দাদী কপালে। আমার দাদী, আমার বাবার দাদী, যতদুর শোনা যায় সবাই দাদীর অনেক আদর- ভালোবাসা পেয়েছে। আমার দাদীকে রাগ করতে দেখিনি খুব বেশি। এতো সহজ-সরল দ্বীলখোলা মানুষ আমি জীবনে খুব কমই দেখেছি। বোন বলেন, মা বলেন সব দায়িত্বই নিখুত ভাবে পালন করেছে, যতদিন বেচে ছিলো। আমাদের চার ভাইয়ের বাড়ি যাবার কথা শুনলেই তার নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হয়ে যেত। দশ মিনট পর পর গেটে এসে চাতকিনীর মতো খুজে বেড়াতেন এই বুঝি এসে গেলাম। তার অপেক্ষার প্রহর শেষ করে যখন তার সামনে যেতাম, ছোট খুকির মতো হালকা অভিমান করে বলতো, আল্লাহ আমি কোন বেনাত্থিকা ঘাটা পওর পাইরত্যাছি, এতো দেরি করা নাগে তাই। পাড়ার বেবাক মানুষ এসে ছাপ তোমাদের খবরি নাই! অজবালী আইসপো কবে?’ এখন বাড়ি গেলে আর তোমাকে পাইনা, গেটের পাড়ে আর কেউ বসে থাকেনা, তোমার মতো করে কেউ ভালোওবাসেনা। আমাদের জন্য জমিয়ে রাখা তোমার ঈদ সেলামী অনেক মিস করি দাদী।  কলিজাটায় চিনচিন করে ওঠে তোমার কথা মনে পড়তেই…..

ঈদে বাড়ির টানে শহর ছাড়া মানুষের মনে এই মূহুর্তে মায়ের কাছে যাওয়ার, দাদীর কাছে যাওয়াই সব থেকে বড় ইস্যু। কোন মিথ্যেবাদী নেতা কি মিথ্যে কথা বললো এটা এখন আর মাথায় ঢুকবেনা তাদের। তাইতো খবর লিখতে বসে দাদীর কথা মনে পড়ে গেলো। ‘পাচ হাজার টাকা খরচ করে নিউজ পোর্টালের সম্পাদক হওয়া আব্দুল জব্বার (কথাটা যে বলেছেন তাকে অনেক ধন্যবাদ) ও বৃহস্পতিবার ( ১৪ জুন) বাড়ি যাবে। ঈদের আমেজ নিয়ে…

সবাইকে অগ্রিম ঈদের শুভেচ্ছা।

(সিরাজগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষা যদি কেউ বুঝতে না পারেন তবে ক্ষমা করতে পারেন অথবা কমেন্ট করে জেনে নিতে পারেন)

লেখক- সম্পাদক, বাংলানিউজমিডিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *