জীবন যখন যু‌দ্ধের মতো : মোহাম্মদ আলী আকন্দ

জীবন যখন যু‌দ্ধের মতো

মোহাম্মদ আলী আকন্দ

নীল সাগর এক্স‌প্রেস। অান্ত নগর ট্রেন। উঠে‌ছি ভোর ৫টা ১মি‌নি‌টে। বঙ্গবন্ধু সেতু প‌শ্চিম থে‌কে। ষ্টেশ‌নে এ‌সে‌ছি পৌ‌নে পাঁচটা নাগাদ। ড্রাইভার না‌মি‌য়ে দি‌য়ে গে‌ছে। এই প্রথম অা‌মি এত সকা‌লে কোথাও যাওয়ার উদ্দে‌শ্যে বে‌ড়ি‌য়ে‌ছি। গন্তব্য ঢাকা। রা‌তেই যাওয়া উচিৎ ছিল।

যাওয়ার তা‌গিদটা পাই আগেরদিন বিকাল চারটা নাগাদ। একটা জরুরী কাগজ স‌মেত এক‌টি সরকারী অ‌ফি‌সে যেতে হবে। শর্ত সকাল নয়টায় পৌছ‌তে হ‌বে। অ‌ফি‌সে বিদ্যুৎ না থাকায় কাগজটা প্রিন্ট কর‌তে পা‌রিনা। খবর নি‌য়ে জা‌নি স‌মেশপুরে বিদ্যুৎ অা‌ছে। চ‌লে অা‌সি স‌মেশপুর। কিন্তু পেনড্রাই‌ভে ভাইরাস জ‌নিত কার‌নে শর্টকাট হ‌য়ে গে‌ছে। এমতাবস্থায় সন্ধ্যা সাতটার দি‌কে অামার অফিস সহায়ক বললো অফি‌সে বিদ্যুৎ এ‌সে‌ছে। অাবার দৌড়াই অফি‌সে। যে‌য়ে দে‌খি ঘুটঘু‌টে অন্ধকার। তুমুল বৃ‌ষ্টি। অ‌নেক সময় অ‌পেক্ষা করি। বিদ্যুৎ বিভা‌গের সা‌থে কথা ব‌লি মাত্র দশ মি‌নি‌টের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য। ওনারা চেষ্টা ক‌রেন। দুই তিনবার অাসে ত‌বে মাত্র দশ সে‌কে‌ন্ডের জন্য। অব‌শে‌ষে কর্তৃপক্ষ দু‌ঃ‌খিত বল‌তে বাধ্য হয়। অা‌মি অসহা‌য়ের মত ফি‌রে অা‌সি বাসায়।

শিউলী ফু‌লের কাব্যকথা  মোহাম্মাদ আলী আকন্দ

দুপু‌রে খাওয়া হয়না অামার কখ‌নোই। বাসায় ফি‌রি, ভাত খাই, চা খাই অারও কিছু খাই। ল্যাপটপ চালু ক‌রে পু‌রো বিষয়‌টি পুনরায় ক‌ম্পোজ ক‌রি। বাই‌রে মুসুলধা‌রে বৃ‌ষ্টি। বিদ্যুৎ এথা‌নেও নেই। ক‌ম্পোজ শেষ ক‌রে বিদ্যু‌তের জন্য অ‌পেক্ষা ক‌রি কখন প্রিন্ট কর‌বো। যা‌হোক রাত বা‌রোট‌ায় কাজটা কর‌তে পারলাম শেষ পর্যন্ত। কিন্তু ঢাকা যাওয়ার উপায় কি? অ‌ফিস থে‌কে বাসায় ফেরার প‌থে মনসুর অালী ষ্টেশ‌নে খোজ নি‌তে গি‌য়ে‌ছিলাম ট্রে‌নের । ষ্টেশন মাষ্টার বলল নয়টার অা‌গে পৌছা‌নোর একটা উপায় রংপুর এক্স‌প্রেস অথবা নীল সাগার এক্স‌প্রেস। ‌ষ্টেশ‌নে এ‌সে দে‌খি ভুতু‌রে অবস্থা। অ‌নেক ডাকাডা‌কির পর একজন শোয়ারত অবস্থায় ঘু‌মের মধ্য থে‌কে বলল ট্রেন অাসুক টি‌কিটের ব্যবস্থা ক‌রে দে‌বো। অ‌পেক্ষায় থাকলাম।

ট্রেন চ‌লে এ‌লো পাচটা বাজার দশ মি‌নিট অা‌গে। ষ্টেশন মাষ্টার‌কে বললাম টিক‌ি‌টের ব্যাবস্থা কর‌তে। উনি বললেন, এখান থে‌কে তো টি‌কিট দেয়া হয়না। টি‌কিট নে‌বেন ট্রে‌নের ভেতর থে‌কে।’ অা‌মি ব‌লি ওরা তো যাত্রা শুরুর ষ্টেশন অর্থাৎ চিলাহা‌টি থে‌কে ভাড়া নে‌বে। ওনার ভাব‌লেশহীন উত্তর তাছাড়া অার উপায় কি? অা‌মি অাশ্চর্য্য হই। ষ্টেশন অা‌ছে, ষ্টেশন মাষ্টার অা‌ছে, ট্রেন থা‌মে, যাত্রী ও‌ঠে কিন্তু টি‌কি‌টের ব্যবস্থা নেই। এ অবস্থায় একজন যাত্রী বলল অা‌মি গত সপ্তা‌হে এই সমস্যায় প‌ড়ে‌ছিলাম। কিন্তু অাজও বাধ্য হ‌য়ে যা‌চ্ছি।

জরুরী কাজ। অামার ড্রাইভার অামায় বল‌লো স্যার গাড়ী নি‌য়ে চ‌লেন যাই। অা‌মি বললাম নয়টার অা‌গে পৌছা‌নো সম্ভব হ‌বে? কারন অা‌মি জা‌নি পাচটায় রওনা দি‌য়ে নয়টায় ঢাকা পৌছা‌নো সম্ভব নয়। ঢাক‌া -টাঙ্গাইল মহাসড়‌কের যে অবস্থা ১১/১২ টা বে‌জে যা‌য় অ‌নেক সময়। ড্রাইভা‌রের মূখ কাল‌চে হ‌য়ে গেল। একজন‌কে জি‌জ্ঞেস করলাম কোন ব‌গি‌তে সিট হ‌বে? ভদ্র‌লোক যে‌নো হা হ‌য়ে গেল। বলল সিট তো সিট, সি‌টের হাতলও পা‌বেন না। দে‌খেন দাড়া‌নোর জন্য দুপা জায়গা পান কিনা?

ভদ্র‌লোক স‌ত্যি ব‌লে‌ছেন। ট্রে‌নে ওঠার পর অামার অবস্থা ত্রা‌হি ত্রা‌হি। দাড়া‌নোর জায়গা নেই। সি‌ড়ির মু‌খে যেই দা‌ড়ি‌য়ে‌ছি ওখানে মে‌ঝে‌তে ব‌সে অা‌ছে চিলাহা‌টি বা রংপুর থে‌কে অাসা এক ম‌হিলা। তিন চার‌টি মে‌য়ে অা‌ছে সা‌থে। রা রা ক‌রে উঠ‌লো। এখা‌নে দাড়া‌বেন না। এখা‌নে দাড়া‌লে লোকজন অামার শরীর মা‌ড়ি‌য়ে বাথরু‌মে যায়। কথাটা সত্য বুঝ‌তে পারলাম। অা‌মি স‌রে অাসলাম। কিন্তু দাড়া‌নোর জায়গা তো নাই। কোনমত এক জায়গায় দাড়ালাম। বঙ্গবন্ধু সেতু পাড় হওয়ার পর অাযান হ‌য়ে গেল। ফজ‌রের। ট্রে‌নের নির্রা‌রিত নামা‌জের জায়গায় যাওয়ার জন্য মুসল্লী‌দের স্রোত শুরু হ‌য়ে গেল।

দা‌ড়ি‌য়ে থাকা দুস্কর। জীবন অ‌তিষ্ঠ হ‌য়ে গেল মানু‌ষের চাপাচা‌পি‌তে। বাথরু‌মে যাওয়া অাসা তো অা‌ছেই। ট্রেনটা তো এ‌সে‌ছে সেই চিলাহা‌টি থে‌কে। ভোর রা‌তে বাথরুম পা‌বে সবার এটাই স্বাভা‌বিক।

জয়‌দেবপুর চ‌লে এ‌সে‌ছি। প্রায় সাতটা বা‌জে। ট্রে‌নের চাপ একটুও ক‌মে‌নি। যেভা‌বে দা‌ড়ি‌য়ে‌ছিলাম সেভা‌বেই দা‌ড়ি‌য়ে অা‌ছি। পা‌য়ে অার পার‌ছেনা। টনটনে ব্যাথা শুরু হ‌য়ে গে‌ছে অ‌নেক অা‌গে থে‌কেই। ছাত্র রাজনী‌তি করার সময় সাম‌রিক শাসকের প্রচন্ড অাঘাত অা‌ছে অামার শরী‌বে। খুব বেশীক্ষন দা‌ড়ি‌য়ে থাক‌তে পা‌রিনা, ব‌সেও না। গাড়ী‌তেও ব‌সে থা‌কি খুব কষ্ট ক‌রে। অাজ‌কের অবস্থা খুব খারাপ। সারারাত এক‌ফোটা ঘুম নেই। সারাটা রাস্তাই দা‌ড়ি‌য়ে যে‌তে হ‌বে। অসম্ভব কষ্ট। অা‌রো একটা বিব্রতকর অবস্থার ম‌ধ্যে অা‌ছি। প‌কে‌টে টি‌কিট নেই। অা‌মি এজীব‌নে কোন‌দিন টি‌কিট ছাড়া ট্রে‌নে উঠি নাই। অাজ উঠে‌ছি। জা‌নিনা কপা‌লে কি অবস্থা অা‌ছে অাজ।

“গোলাপী‌ এখন ট্রে‌নে” সি‌নেমার কথা খুব ম‌নে প‌ড়ে গেল। সুনীল গ‌ঙ্গোপাধ্যায়ের ক‌বিত‌াও খুব ম‌নের ম‌ধ্যে বাজ‌ছে। কা‌নে এয়ার‌ফোন লা‌গি‌য়ে সারা রাস্তায় শুন‌তে চে‌য়ে‌ছিলাম প্রিয়ান্কা গো‌পের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। অথবা রাগ নির্ভর নজরুল সঙ্গীত। কিন্ত এখন সুনীলদা খুব ক‌রে কা‌ছে চ‌লে এ‌সে‌ছে অামার – “‌নি‌খি‌লেশ তুই এ‌সে দে‌খে যা ‌ অা‌মি কিরকম ভা‌বে বে‌চে অা‌ছি, এই কি মানুষ জীবন না কি শেষ পু‌রো‌হিত কঙ্কালের সা‌থে পাশা খেলা”। জয়‌দেব পুর সকাল ৭.০০ টা ২৭/০২/১৮

লেখক- রাজনীতিবিদ ও কবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *